শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

গন্তব্য জানা নাই

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

বিকেল থেকেই টানা বৃষ্টি। চারদিকে অন্ধকার। ঘড়ির কাঁটা দেখা ছাড়া বোঝার উপায় ছিলো না দিন কিংবা রাত। বিদ্যুৎ কখন আসে-যায় সেটাও গণনার বাইরে। ভালো আবহাওয়াতেই বিদ্যুতের দেখা মিলে অমাবস্যার চাঁদের মতো। আবহাওয়া খারাপ থাকলে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। হাতের আন্দাজে দরজা-জানালায় খিল আটকিয়ে দিলেন সফুরা বেগম। হঠাৎ খটাখট শব্দ শুনে মাথার কাছে রাখা বাটন মোবাইল ফোনটির টর্চবাটন অন করলেন আবুল মিয়া। সাথে সাথে ফোকাসের সামনে ভেসে উঠল স্ত্রী সফুরা বেগমের মুখটি। যে মুখের উপর এমন বিবর্ণ রূপ তিনি বিদ্যুৎ থাকলে কখনো দেখতে পেতেন না। অবশ্য এমন একটি অনাকাঙ্কিষত সুন্দর সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য আবুল মিয়া কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসে দায়িত্বে থাকা ছেলেদের মনে মনে ধন্যবাদ দিতে ভুল করেননি। সফুরা বেগম বাম হাতের তালুতে চক্ষুদ্বয় ঢেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, ঘরে বাতি নেই অথচ ওঁনি আছেন ঢঙ নিয়া! একটা চার্জার লাইট আননের লাইগা কয়বার টাকা দিছি, হিসাব নাই। টাকা খাইয়া ফালান ওঁনি!

 à¦¸à§à¦¤à§à¦°à§€à¦° মেজাজ দেখে চুপসে গেলেন আবুল মিয়া। তিনি জানেন, গরম তেলে পানি দিয়ে তেলফোঁটার চেঁৎ চেঁৎ আনন্দে মজা নেওয়ার ব্যাপারটার মাঝে যে ভিন্ন ধরনের একটা আরাম আছে তা হয়তো বুঝতে চাইবেন না তাঁর স্ত্রী সফুরা বেগম। বাধ্য হয়েই তিনি কোলের কাছে ঘুমন্ত ছয় বছরের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মোবাইল ফোনের লাইট বাটন অফ করে দিলেন। সফুরা বেগম আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, লাইট বন্ধ করছেন ক্যান? রান্না করণ লাগবো না? পেটে তো মেঘ-বৃষ্টি মানবো না, পেটের খাবার লাগবো। কেমনে যে রান্না করবু...।

 à¦¸à§à¦¤à§à¦°à§€à¦° কথায় উত্তর দিয়ে আগুনে ঘি ঢালতে চাইলেন না আবুল মিয়া। তবু ইতস্ততভাবে চাপা গলায় বললেন, আইজ না রান্না করলে হয় না? মুড়ি-টুড়ি খাইয়া না হয়...!

ক্যামনে হইবু, দুপুরেও খাইছেন না। ঠাণ্ডা ভাত খাইতে পারলে তো মুঠমুঠ ভাগ করে খাইয়া নিতাম।

টুনি খাইছিলো? খাইয়া থাকলে আমরাও অল্পস্বল্প খাইয়া জড়াজড়ি করে ঘুমাইয়া যাই! 

 à¦•থাগুলো বলেই আবুল মিয়া সফুরা বেগমের মুখের দিকে বাঁকা চোখে তাকালেন। তিনি দেখলেন, মেঘের ভেতর থেকে একফালি চাঁদের হাসি উঁকি দিয়ে নিমিষেই মিলিয়ে গেলো।

 à¦¬à¦¾à¦‡à¦°à§‡ অঝোর বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। টিনের চাল যেনো মেঘকান্নার আওয়াজ আর সইতে পারছে না। বৃষ্টির সাথে তাল রেখে গর্জন করে যাচ্ছে মেঘও। বিভৎস শব্দে একটু পরপর কেঁপে উঠছে ঘুমন্ত টুনি। বাবা আবুল মিয়া তখন মেয়েকে নিজের বুকের দিকে আগলে ধরেন। চালের টিনগুলো যেখানে ছিদ্র রয়েছে সেদিক দিয়ে চৌবাচ্চার নলের মতো পানি পড়ার প্রতিযোগিতা চলছে। সফুরা বেগম বিকেল থেকেই ছিদ্রগুলো খেয়াল করে হাঁড়ি-পাতিল বসিয়ে দিয়েছিলেন। এগুলোতে জমাটবদ্ধ পানি কিছুক্ষণ পরপর সাফ করে দিচ্ছেন তিনি। আর স্বামীর উদ্দেশ্যে বিড়বির করে বলছেন, গরীবের ঘরে খালি শুকনো আবেগ, চালের টিনগুলো বদলানোর ভেজা আবেগ নেই। আইজকাইলকার যুগেও মানুষের এমন ভাঙারোঙা ঘর থাকে?

আবুল মিয়া স্ত্রীর কথায় কান দিলেন না ঠিকই তবে কিছুটা নীরব কষ্টের রঙ তার চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বেড়ার দিকে তাকালেন। চালের নিচে ভেলকির ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে ঘন কুয়াশার বৃষ্টির ধোঁয়া ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি হাসার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। ভাবেন, এইবার ফসলটা উঠলে ঘরের চালগুলো মেরামত করাবেন।

একখানা প্লেটে অল্প ঠাণ্ডা ভাত আর কাঁঠালের বিচিভর্তা নিয়ে এলেন সফুরা বেগম। পাশে রাখলেন জগভর্তি পানি ও একখানি গ্লাস। স্বামী-স্ত্রী ভাগাভাগি করে খেতে খেতে সফুরা বেগম বললেন, গরীবের ঘরে আল্লাহ স্বর্গসুখ দিয়েছেন। খুব কম বড়লোকের ঘরেই স্বামী-স্ত্রী এক প্লেটে খাইতে পারে? পেট না ভরলেও শান্তি, তাই না? 

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন আবুল মিয়া। সম্ভবত স্ত্রীর কথায় তিনি ভেতর থেকে গলে পড়েছিলেন কোনো এক অন্য মমতায়। কথা না বাড়িয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে শুইয়ে পড়লেন মেয়ের পাশে। সফুরা বেগমও প্লেট, গ্লাস ও জগ গুছিয়ে স্বামীর পাশে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলেন।

কী একটা স্বপ্ন দেখে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো সফুরা বেগমের। চোখ খোলার আগেই বুঝতে পারলেন, বিছানাটা ভেজা। চটজলদি উঠে পড়লেন তিনি। টুনিকে কোলে নিয়েই স্বামীকে ধাক্কা দিলেন সজাগ করানোর চেষ্টায়। আবুল মিয়ার সাথে সাথে টুনিরও ঘুম ভেঙে গেলো। মোবাইল ফোনের লাইটবাটন অন করার চেষ্টা করলেন আবুল মিয়া, পারলেন না। পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে আছে এটি। 

     à¦†à¦•াশে বৃষ্টি ছিলো না তখন। মাঝেমধ্যে বিজলি ছিলো। বিজলির আলোয় আবুল মিয়া বিছানা থেকে নেমে দেখেন, মেঝেতে কোমর পানি! দরজাটা খুলে দিতেই তাঁদের কুকুরটি ঘরের ভেতরে ঢুকে বিছানায় উঠে দাঁড়ালো। হঠাৎ আবুল মিয়া শুনতে পেলেন, পাড়ার মসজিদ থেকে মাইকযোগে কেউ কাঁপা কাঁপা স্বরে বলছেন, বাঁধ ভেঙে উজানের পানি ঢুকে গেছে! আমাদের আশেপাশের অনেক গ্রাম ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে! সবাই নিরাপদ জায়গায় চলে যান। আমাদের কিছু সাহায্যকারী নৌকা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠে আছেন, আপনারা যে যার অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করুন। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠলেন আবুল মিয়া। তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। সফুরা বেগমও কান্নায় ভেঙে পড়লেন, কই যাবু আমরা, নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে? আল্লাহ গো কি হইবু আমাদের?

 à¦•ান্না-চিৎকারে টুনিরও ঘুম ভেঙে গেলো। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারলো না। শূন্য হাতেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেন আবুল মিয়া ও তার আপনজন। 

উঠোনে যেতেই সফুরা বেগমের মনে পড়লো তাঁদের পোষা কুকুরটির কথা। তিনি পেছনে ফেরার আগেই দেখেন, কুকুরটিও তাদের সাথে পানিতে, মাথাটি ভেসে আছে ওর। কিছুদূর সাঁতরিয়ে যাওয়ার পর কুকুরটি হাঁপিয়ে ওঠে। সাঁতার কাটতে পারছে না আর। বিজলির আলোতে দেখা গেলো ওর চোখ দুটো জলে ঝাপসা। হয়তো কুকুরটি ওর চোখের জলে বোঝানোর চেষ্টা করছে, বেঁচে থাকলে দেখা হবে প্রভু! বিদায়! 

 à¦¬à§à¦•ে পাথর বেঁধে স্ত্রীর হাত চেপে ধরে সামনের দিকে হাঁটলেন আবুল মিয়া। কিন্তু গন্তব্য কোথায় কিছুই জানেন à¦¨à¦¾ তিনি। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ